আপনি কি জার্মানি গিয়ে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখছেন? ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে জার্মানি তাদের ইমিগ্রেশন সিস্টেমে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, যার নাম ‘Chancenkarte’ বা Opportunity Card। পুরোনো জটিল জব সিকার ভিসার দিন শেষ; এখন যোগ্যতা থাকলে পয়েন্টের ভিত্তিতেই আপনি জার্মানি যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
আপনি বাংলাদেশ বা ভারত—যেখান থেকেই আবেদন করুন না কেন, ২০২৫ সালে জার্মানি যাওয়ার জন্য এটিই এখন সবচেয়ে সহজ রুট। আজকের গাইডে আমরা দেখব নতুন নিয়ম অনুযায়ী আপনার যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করবেন এবং আবেদনের সঠিক প্রক্রিয়া কী।
অপরচুনিটি কার্ড (Opportunity Card) আসলে কী?
সহজ কথায়, এটি একটি পয়েন্ট-ভিত্তিক রেসিডেন্স পারমিট। আগে জার্মানি যেতে হলে হাতে চাকরির অফার লেটার থাকা লাগত। কিন্তু এই কার্ড থাকলে আপনি কোনো জব অফার ছাড়াই জার্মানিতে ১ বছরের জন্য থাকার অনুমতি পাবেন এবং সেখানে গিয়ে চাকরি খুঁজতে পারবেন।
সবচেয়ে বড় সুবিধা? চাকরি খোঁজার সময় আপনি সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা পার্ট-টাইম কাজ করতে পারবেন, যা আগের নিয়মে সম্ভব ছিল না। এতে আপনার নিজের খরচ চালানো অনেক সহজ হয়ে যাবে।
আবেদনের যোগ্যতা: আপনি কি এলিজিবল?
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আবেদন করার জন্য দুটি উপায় (Pathway) আছে।
১. স্কিলড ওয়ার্কার (Skilled Worker)
আপনার যদি জার্মানি দ্বারা স্বীকৃত (Recognized) কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি বা ভোকেশনাল ট্রেনিং থাকে, তবে আপনার কোনো পয়েন্টের প্রয়োজন নেই। আপনি সরাসরি আবেদনের যোগ্য।
২. পয়েন্ট সিস্টেম (Points-Based) – অধিকাংশের জন্য প্রযোজ্য
আপনার ডিগ্রি যদি জার্মানিতে পুরোপুরি স্বীকৃত না-ও হয়, তবুও আপনি আবেদন করতে পারবেন যদি আপনি নূন্যতম ৬ পয়েন্ট অর্জন করতে পারেন।
শর্তসমূহ (Basic Requirements):
- শিক্ষা: দেশীয় সরকার স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি বা ২ বছরের ভোকেশনাল ট্রেনিং।
- ভাষা: জার্মান ভাষা (লেভেল A1) অথবা ইংরেজি ভাষা (লেভেল B2/IELTS)।
পয়েন্ট ক্যালকুলেটর (২০২৫ আপডেট):
আপনার প্রোফাইল অনুযায়ী পয়েন্ট হিসাব করুন:
| যোগ্যতা (Criteria) | পয়েন্ট (Points) |
| ভাষা দক্ষতা | জার্মান B2 = ৩ পয়েন্ট, B1 = ২ পয়েন্ট, A1-A2 = ১ পয়েন্ট। ইংরেজি C1 = ১ পয়েন্ট। |
| কাজের অভিজ্ঞতা | গত ৫ বছরের মধ্যে ২ বছরের পেশাদার অভিজ্ঞতা = ২ পয়েন্ট। ৫ বছরের অভিজ্ঞতা = ৩ পয়েন্ট। |
| বয়স | ৩৫ বছরের নিচে = ২ পয়েন্ট। ৩৬-৪০ বছর = ১ পয়েন্ট। |
| জার্মানির সাথে সম্পর্ক | গত ৫ বছরে অন্তত ৬ মাস বৈধভাবে জার্মানিতে থাকার প্রমাণ = ১ পয়েন্ট। |
| Life Partner | আপনার স্বামী/স্ত্রীও যদি যোগ্য হন = ১ পয়েন্ট। |
প্রো টিপ: আপনার বয়স যদি ৩৫-এর কম হয় এবং ইংরেজি ভালো জানেন (IELTS 6.0+ equivalent), তবেই আপনি প্রায় ৩-৪ পয়েন্ট পেয়ে যাবেন। বাকি পয়েন্ট কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব।
আর্থিক সচ্ছলতা (Financial Requirement)
ভিসা পাওয়ার জন্য আপনাকে প্রমাণ করতে হবে যে জার্মানিতে থাকার খরচ আপনার আছে। ২০২৫ সালের সম্ভাব্য নিয়ম অনুযায়ী, আপনাকে একটি Blocked Account খুলতে হবে।
- পরিমাণ: প্রতি মাসে আনুমানিক €১,০২৭ ইউরো (২০২৪-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-এ সামান্য বাড়তে পারে)।
- মোট ১২ মাসের জন্য প্রায় €১২,৩২৪ ইউরো ব্লকড অ্যাকাউন্টে দেখাতে হতে পারে।
আবেদন প্রক্রিয়া: ধাপে ধাপে (Step-by-Step)
ধাপ ১: যোগ্যতা যাচাই
প্রথমে জার্মানির সরকারি ওয়েবসাইট বা ‘Make it in Germany’ পোর্টালে গিয়ে নিজের পয়েন্ট চেক করুন।
ধাপ ২: নথিপত্র সংগ্রহ (Documentation)
- পাসপোর্ট ও ছবি।
- শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ (IAB বা ZAB থেকে ভেরিফিকেশন লাগতে পারে)।
- ভাষার সার্টিফিকেট (IELTS বা Goethe/Telc)।
- কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণপত্র।
- Motivation Letter: কেন আপনি জার্মানি যেতে চান এবং আপনার পরিকল্পনা কী—এটি খুব সুন্দরভাবে লিখতে হবে।
ধাপ ৩: অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও ভিসা ইন্টারভিউ
আপনার দেশের জার্মান দূতাবাসে (Embassy/Consulate) অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করুন। অপরচুনিটি কার্ডের জন্য বর্তমানে স্লট পাওয়া কিছুটা সহজ।
ধাপ ৪: ব্লকড অ্যাকাউন্ট ও ইনস্যুরেন্স
ভিসা ইন্টারভিউয়ের আগে বা পরে আপনাকে Expatrio বা Fintiba-র মতো কোনো প্রোভাইডারের মাধ্যমে ব্লকড অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে এবং ট্রাভেল ইনস্যুরেন্স নিতে হবে।
শেষ কথা: কেন এখনই আবেদন করবেন?
জার্মানির শ্রমবাজারে বর্তমানে প্রায় ২ মিলিয়ন কর্মী সংকট রয়েছে। ২০২৫ সালে তারা প্রচুর বিদেশি কর্মী নেবে। তাই নিয়ম পরিবর্তন হওয়ার আগেই বা কম্পিটিশন বাড়ার আগেই আপনার প্রোফাইল গুছিয়ে আবেদন করা বুদ্ধিমানের কাজ।
আপনার জার্মানি যাত্রা শুভ হোক!
